দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ে তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলনগুলো বড় প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে নেপাল ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় যুব-নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে এই দুই দেশের আন্দোলনের পটভূমি, নেতৃত্ব ও ফলাফল একেবারেই আলাদা। তাই নেপালের রাষ্ট্রীয় স্বাধীন পার্টি (আরএসপি) এবং বাংলাদেশের জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর মধ্যে সরাসরি তুলনা করা অনেক ক্ষেত্রে সঠিক নয়।
দুই দলই তরুণদের সমর্থন পেয়ে আলোচনায় এসেছে। কিন্তু যে বিদ্রোহী আন্দোলনগুলোর প্রেক্ষাপটে তারা পরিচিতি পেয়েছে, সেগুলোর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক সম্পূর্ণ ভিন্ন।
২০২৫ সালের যুব বিদ্রোহে আরএসপির সরাসরি ভূমিকা ছিল না
নেপালে ২০২২ সালে টেলিভিশন সাংবাদিক রবি লামিছানে আরএসপি প্রতিষ্ঠা করেন। দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান, স্বচ্ছতা এবং সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে দলটি দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি তরুণদের হতাশা আরএসপির উত্থানকে ত্বরান্বিত করলেও ২০২৫ সালের যুব-নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহের সঙ্গে দলটির সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল না।
নেপালে তখন হামি নেপালের মতো বিভিন্ন কর্মী সংগঠনের নেতৃত্বে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এসব আন্দোলনের পেছনে ছিল সরকারি দুর্নীতি, মতপ্রকাশে বাধা এবং তরুণদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ভোটাধিকার বঞ্চনার মতো ইস্যু।
এই আন্দোলনের অন্যতম মুখ ছিলেন সুদান গুরুং। তিনি বিক্ষোভে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও স্পষ্টভাবে নিজেকে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত করেননি।
মূলত এই আন্দোলনগুলো ছিল তৃণমূল পর্যায়ের এবং অনেকটা নেতৃত্বহীন ধরনের। সুদান গুরুং আন্দোলনের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে সামনে এলেও তিনি বারবার জোর দেন যে এটি কোনো রাজনৈতিক দলের আন্দোলন নয়; বরং তরুণদের ক্ষমতায়ন ও ব্যবস্থাগত পরিবর্তনের দাবিতে গড়ে ওঠা একটি উদ্যোগ। লক্ষ্য ছিল যুবসমাজের কণ্ঠস্বরকে সামনে আনা এবং প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে থেকে পরিবর্তনের দাবি তোলা।
এনসিপির জন্ম বিদ্রোহ-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায়
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চিত্রটি ছিল ভিন্ন। এখানে যুব আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতেই জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গঠিত হয়। সরকার যুবসমাজের নানা সমস্যার সমাধান করতে ব্যর্থ হওয়া এবং রাজনৈতিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষ—এই দুইয়ের সমন্বয় থেকে আন্দোলনের সৃষ্টি হয়।
এই বিক্ষোভে তৈরি হওয়া ক্ষোভকে রাজনৈতিক রূপ দেওয়ার লক্ষ্যেই এনসিপি আত্মপ্রকাশ করে। দলটি নিজেদেরকে প্রচলিত রাজনৈতিক অভিজাতদের বিকল্প হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করে। ফলে বিদ্রোহের পর নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটে—যা নেপালের পরিস্থিতি থেকে একেবারেই আলাদা।
রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের দিক থেকেও বড় পার্থক্য
দুই দেশের আন্দোলনের সবচেয়ে বড় পার্থক্য তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে। নেপালে সুদান গুরুং ও তার সহযোগীরা সচেতনভাবেই আন্দোলনকে অরাজনৈতিক রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তারা বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যুক্ত না হয়ে বাইরে থেকেই ব্যবস্থার সংস্কার চাইছিলেন।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আন্দোলনের নেতৃত্ব রাজনৈতিক পথই বেছে নেয়। এনসিপি শুরু থেকেই একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং আন্দোলনের শক্তিকে প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতিতে রূপ দিতে চেষ্টা করে।
নাহিদ ইসলামসহ আন্দোলনের নেতারা আনুষ্ঠানিক রাজনীতি থেকে দূরে থাকেননি। বরং জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার মতো একটি দল গঠন করে আন্দোলনের অর্জনকে রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করার উদ্যোগ নেন। এভাবেই প্রতিবাদ সরাসরি একটি নতুন রাজনৈতিক সংগঠনের জন্ম দেয়।
প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ও ভিন্ন
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো দল দুটি গঠনের সময়। নেপালের আরএসপি জেনারেশন জেড নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভের অনেক আগেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। যদিও দলটির নীতিমালা তরুণদের সংস্কারবাদী আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে মিল রয়েছে, তবু ২০২৫ সালের বিদ্রোহে তারা সরাসরি যুক্ত ছিল না।
বরং পরবর্তীতে পুরোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি মানুষের বাড়তে থাকা অসন্তোষকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করে দলটি।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের এনসিপির অস্তিত্বই মূলত ২০২৪ সালের বিদ্রোহের ফল। সেই আন্দোলনের গতি ও জনসমর্থন না থাকলে দলটির উত্থান সম্ভব হতো না।
মিল থাকলেও পথ আলাদা
নেপালের আরএসপি এবং বাংলাদেশের এনসিপি—দুটি দলই তরুণদের সমর্থন এবং সংস্কারের দাবিকে সামনে নিয়ে এগিয়েছে। তবে তাদের জন্ম, আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্ক এবং রাজনৈতিক লক্ষ্য—সবকিছুতেই স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে।
একদিকে নেপালে আরএসপি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বিক্ষোভের আগেই এবং সেই আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিল না। অন্যদিকে বাংলাদেশের এনসিপি ছিল আন্দোলনের সরাসরি রাজনৈতিক প্রতিফলন। তাই দুই দলের মধ্যে সরাসরি তুলনা করা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সূত্র: দ্য ডেল্টাগ্রাম