১৮৮৭ সালের ১১ নভেম্বর, যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় রাজ্যের কুক কাউন্টি জেলখানা। ফাঁসির মঞ্চ প্রস্তুত। একে একে তিনজনের মৃত্যদণ্ড কার্যকর করা হল। অপর অভিযুক্তকে যখন গলায় দড়ি ঝুলিয়ে দিতে জল্লাদ ধিরে ধিরে এগিয়ে আসছে, হাত বাঁধা অবস্থায় তিনি চিৎকার করে বললেন, “There will be a time when our silence will be more powerful than the voices you strangle today.”
যে কণ্ঠস্বর দমন করছ, একদিন আমাদের নীরবতা এর চেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠবে- এই বক্তব্য বৃথা যায়নি। ছড়িয়ে পড়েছে সারাবিশ্বে, সমস্ত শ্রমিক এবং মালিকের শ্রবণে বিঁধে গেছে প্রত্যেকটা শব্দ। ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে স্বপ্নের বাক্য উচ্চারণ করা সেই ব্যক্তি অগাস্ট স্পাইস। ১৮৫৫ সালে জার্মানিতে জন্ম নেওয়া স্পাইস ১৮৭২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন। আসবাব-পত্র তৈরির কারিগর থেকে ধিরে ধিরে হয়ে ওঠেন শ্রমিক আন্দোলনের সবচেয়ে সক্রিয় নেতৃত্ব৷ জার্মান ভাষায় পরিচালিত 'Arbeiter-zeitung' পত্রিকার সম্পাদনা করার মাধ্যমে তিনি শ্রমিকের অধিকার আদায়ের কন্ঠস্বরে পরিণত হন।
হে মার্কেট থেকে ফাঁসির মঞ্চ
১৮৮৬ সালের ১ মে। আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেট স্কয়ার। ধোঁয়া আর ধুলোয় মিশে থাকা সেই রাজপথ কি সেদিন জানত, এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে সেটি শ্রমজীবী মানুষের অধিকারের প্রধান তীর্থস্থান হয়ে থাকবে?শিল্প বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে শ্রমিকদের অবস্থা ছিল দাসের মতো।
কোনো নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা ছিল না, ছিল না ন্যুনতম নিরাপত্তা। ১৮৮৪ সালে শিকাগোর শ্রমিক সংগঠনগুলো দাবি তোলে—'আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা বিনোদন এবং আট ঘণ্টা বিশ্রাম।' মালিকপক্ষ এই দাবি কানেই তোলেনি। ফলস্বরূপ, ১৮৮৬ সালের ১ মে হাজার হাজার শ্রমিক রাজপথে নেমে আসেন। ৩ মে পুলিশের গুলিতে কয়েকজন শ্রমিক নিহত হলে পরদিন ৪ মে হে মার্কেটে এক বিশাল প্রতিবাদ সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়। ৪ মে সন্ধ্যার দিকে সমাবেশ যখন শেষ পর্যায়ে, ঠিক তখনই ঘটে ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ও বিতর্কিত এক হত্যাকাণ্ড। হঠাৎ করেই জমায়েতের মধ্যে একটি শক্তিশালী বোমা বিস্ফোরিত হয়। এই হামলায় সাতজন পুলিশ সদস্য নিহত হন এবং আরও অনেকে আহত হন।
আজ পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি বোমাটি আসলে কে ছুড়েছিল। যদিও শ্রমিক নেতাদের ওপর দোষ চাপানো হয়েছিল, কিন্তু অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, শ্রমিকদের আন্দোলনকে দমন করার জন্য এটি ছিল কোনো পক্ষের সুপরিকল্পিত ‘প্রোভোকেশন’ বা সাজানো চাল। কিন্তু এই একটি বোমাই মে দিবসের ইতিহাসকে চিরস্থায়ী রূপ দেয়।
প্রহসনের বিচার
পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগে আটজন শ্রমিক নেতাকে গ্রেফতার করা হয়। অগাস্ট স্পাইস, আলবার্ট পারসনস, এডলফ ফিশার এবং জর্জ এঙ্গেলসহ মোট চারজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। যদিও তাদের বিরুদ্ধে বোমা হামলার কোনো অকাট্য প্রমাণ ছিল না; শুধু তাদের বিপ্লবী চিন্তাধারার কারণেই ফাঁসির মঞ্চে পাঠানো হয়।
১৮৮৭ সালের ১১ নভেম্বর। ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে শ্রমিক নেতা আগস্ট পিস যে কথাগুলো বলেছিলেন, তা আজও প্রতিটি অধিকারকামী মানুষের কানে প্রতিধ্বনিত হয়। "এমন একটা সময় আসবে, যখন আমাদের নীরবতা তোমরা আজ যে কণ্ঠরোধ করছ তার চেয়েও বেশি শক্তিশালী হবে।" তার সেই কথা অক্ষরে অক্ষরে সত্য হয়েছে। বিপ্লবীদের সেই ‘নীরবতা’ আজ বিশ্বজুড়ে মে দিবসের স্লোগানে পরিণত হয়েছে।
আন্দোলনের সূতিকাগার যুক্তরাষ্ট্রে পালিত হয় না 'মে দিবস'
মজার ব্যাপার হলো, যে দেশে মে দিবসের জন্ম, সেই আমেরিকায় ১ মে শ্রম দিবস পালন করা হয় না। তারা সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সোমবারকে ‘লেবার ডে’ হিসেবে পালন করে।
টাইপরাইটার বনাম মে দিবস
শিকাগোর সেই ধর্মঘট চলাকালে অনেক জায়গায় দেখা গিয়েছিল টাইপরাইটার আবিষ্কারের প্রাথমিক মডেলগুলো ব্যবহার করে শ্রমিকরা তাদের দাবি লিখে বিলি করছেন।
মে দিবসের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
১৮৮৯ সালে ১৪ জুলাই প্যারিসে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে ১ মে-কে আন্তর্জাতিক 'শ্রমিক সংহতি দিবস' বা 'মে দিবস' হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী পূঁজিবাদী দেশ যুক্তরাষ্ট্র, দশকের পর দশক ধরে পৃথিবীতে পূঁজিবাদ টিকিয়ে রাখার নেতৃত্ব দিয়ে আসছে দেশটি। যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো রাজ্যের হে মার্কেটে শুরু হওয়া শ্রমিক আন্দোলন শুধু আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি বা ন্যায্য কর্মঘন্টা অর্জন করেনি, এর মধ্য দিয়ে পূঁজিবাদের পেটে বিস্ফোরিত হয়েছে অধিকারকামী মানুষের ঐতিহাসিক সংগ্রাম। এই সংগ্রাম কাঁপিয়ে দিয়েছে পুঁজিপতি আর মালিক শ্রেণির গদি।
যেকারণে, আজকের 'মে দিবস' কেবল লাল পতাকা উড়িয়ে মিছিলের দিন নয়; এটি শ্রমিক ও মালিকের মধ্যকার বৈষম্য ঘোচানোর এক অঙ্গীকার। হে মার্কেটের সেই রক্ত যেন বৃথা না যায়, সেজন্যই প্রতিটি কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। অগাস্ট পিস ঠিকই বলেছিলেন, সেই ফাঁসির দড়িতে তাদের কণ্ঠ স্তব্ধ হয়নি, বরং তা ছড়িয়ে পড়েছে কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে।